হাসি-ঠাট্টা করা দম্পতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয় — নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য

লেখক: দ্য ঢাকা লেজার
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

সম্পর্ক

ভালোবাসায় হাসির শক্তি

সম্পর্কে হাসি শুধুমাত্র আনন্দের প্রকাশ নয়, এটি হতে পারে গভীর ঘনিষ্ঠতা ও সন্তুষ্টির চাবিকাঠি। সম্প্রতি Canadian Journal of Human Sexuality-এ প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতি তাদের যৌনজীবন নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে হালকা রসিকতা করেন, তারা নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুখী ও পরিতৃপ্ত।

গবেষণাটি মূলত যৌন সম্পর্কের মানসিক দিক এবং পারস্পরিক হাস্যরসের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, দম্পতিদের মধ্যে ‘ইনসাইড জোকস’, হালকা শারীরিক হাস্যরস, কিংবা বিব্রতকর পরিস্থিতি মজার ছলে সামাল দেওয়ার মতো অভ্যাস তাদের মধ্যে বাড়ায় “স্বস্তি, আনন্দ এবং ঘনিষ্ঠতা”।

গবেষণার  কাঠামো ও অংশগ্রহণকারীরা

গবেষণায় অংশ নেন মোট ১৯৬ জন স্বেচ্ছাসেবক, যাদের সম্পর্কের মেয়াদ অন্তত চার মাস এবং গড় হিসেবে দুই বছরেরও বেশি। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন তরুণ, বয়সের গড় প্রায় ২০ বছর। তাঁদের অনলাইন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করা হয়— কীভাবে তারা সম্পর্কের মধ্যে রসিকতা ব্যবহার করেন এবং তাতে যৌনজীবনে কোনো পরিবর্তন আসে কি না।

ফলাফল ছিল স্পষ্ট— যারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত নিয়ে ইতিবাচক রসিকতা করেন, তারা নিজেদের সম্পর্ক ও যৌনজীবন উভয় ক্ষেত্রেই বেশি তৃপ্ত।

হাস্যরসের ইতিবাচক প্রভাব

গবেষকরা জানান, “যেসব দম্পতি নিয়মিতভাবে ইতিবাচক হাস্যরস ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে যৌন রসিকতাও বেশি ইতিবাচক হয়। অন্যদিকে, যেসব সম্পর্কের মধ্যে নেতিবাচক বা বিদ্রূপাত্মক হাস্যরস প্রবল, তাদের সম্পর্কের সন্তুষ্টি কমে যায়।”

অর্থাৎ, সম্পর্কের মধ্যে হাস্যরস থাকলেই হবে না— সেটি যেন ইতিবাচক হয়, সেটিই মূল বিষয়। একে অপরকে ছোট না করে বরং একসঙ্গে হাসতে পারা সম্পর্কের স্থায়িত্বের অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে।

যৌন জীবনে রসিকতা কতটা কার্যকর

গবেষণাটি জানায়, যৌন বিষয়ে ইতিবাচক রসিকতা শুধু সম্পর্কের নয়, যৌন সন্তুষ্টিরও নির্ভরযোগ্য সূচক হতে পারে। গবেষকদের ভাষায়, “More positively valenced sexual humor predicted sexual satisfaction over and above relationship satisfaction and relational humor।”
অর্থাৎ, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ছাড়াও যৌন বিষয়ে হালকা রসিকতা আলাদাভাবে আনন্দ ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে।

আরও পড়ুন  মনকে শান্ত রাখুন: ঈর্ষা থেকে মুক্তির সহজ কৌশল

অস্বস্তি দূর করতে হাসি হতে পারে সেতুবন্ধন

গবেষণায় আরও বলা হয়, “যৌন রসিকতা অনেক সময় অস্বস্তিকর মুহূর্তকে সহজ করে তোলে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার নতুন পথ খুলে দেয়।”
এটি এমন এক নিরাপদ জায়গা তৈরি করে, যেখানে দুজনই নিজেদের খোলামেলা ভাবে প্রকাশ করতে পারেন। সম্পর্কের শুরুতে বা দীর্ঘ সময় পর, উভয় ক্ষেত্রেই এই রসিকতা যোগাযোগকে মজবুত করে।

মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোমান্টিক সম্পর্কে রসিকতা অনেকটা সামাজিক আঠার মতো কাজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক “The Dhaka Ledger”-কে জানান, “রসিকতা আমাদের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন ও ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার হরমোন হিসেবে কাজ করে। ফলে, যারা পরস্পরের সঙ্গে বেশি হাসে, তাদের মানসিক বন্ধনও শক্তিশালী হয়।”

তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশি সমাজে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো ট্যাবু, কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে— যৌন জীবনে হালকা হাস্যরস আসলে দাম্পত্য সম্পর্কে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।”

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে তাৎপর্য

বাংলাদেশে দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা আলোচনা প্রায়ই সীমিত থাকে। অনেক সময় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ট্যাবু সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি দম্পতিরা একে অপরের সঙ্গে হালকা রসিকতা ও হাসি ভাগাভাগি করতে পারেন, তবে তাদের মানসিক চাপ কমে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।

ঢাকায় এক বিবাহিত দম্পতি জানালেন, “আমরা কাজের চাপে অনেক সময় একে অপরকে সময় দিতে পারি না, কিন্তু সন্ধ্যায় একসঙ্গে বসে হালকা মজা করি— এটা আমাদের সম্পর্ককে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে।”

বিশ্বজুড়ে সম্পর্কের গবেষণায় নতুন মাত্রা

এই গবেষণাটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন বিশ্বজুড়ে সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে নানা গবেষণা চলছে। মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন জীবন, এবং আবেগীয় সংযোগ— সবকিছুই আধুনিক দম্পতিদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
Canadian Journal of Human Sexuality-এর এই প্রতিবেদন সেই আলোচনাকে আরও বৈজ্ঞানিক রূপ দিয়েছে।

আরও পড়ুন  বায়ুদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কী করবেন

গবেষণার উপসংহার

গবেষক দলের ভাষায়, “Relationship and sexual humor are related to both relationship and sexual satisfaction.”
অর্থাৎ, রোমান্টিক ও যৌন সম্পর্ক— উভয় ক্ষেত্রেই হাস্যরস একটি সেতু হিসেবে কাজ করে যা পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়ায়।

সূত্র: Canadian Journal of Human Sexuality (2025)